সাল টা ১৯৯৯ , পুরো উত্তরবঙ্গ জুড়ে দুদিন ধরে মুষলধারে বৃষ্টি, অনেক জায়গায় বন্যা পরিস্থিতি , কারেন্ট নেই ম্যাক্সিমাম জায়গাতেই ।
রাত ১টা, বিহারের কিষানগঞ্জে তখন রাতের ব্যাস্ততা, একে বৃষ্টি তার উপর দুদিন ধরে প্যানেল ইন্টারলকিইং সিস্টেমের আপগ্রেডের কাজ চলায় ম্যাক্সিমাম ট্রেনকেই ম্যানুয়ালি পয়েন্টের মুভমেন্ট করে পাস করতে হচ্ছিল ।
কিষানগঞ্জ স্টেশনে ঢোকে অবধ-আসাম এক্সপ্রেস , প্রায় 6 ঘন্টা লেট, তার উপর এক টানা বৃষ্টি।
অবধ আসাম এক্সপ্রেসের যাবার কথা ছিল আপ লাইনে, কিন্ত কোনো এক পয়েন্টম্যানের ভুলে তা চলে যায় ডাউন লাইন দিয়ে ।
কিষানগঞ্জের A S M H.M. SINGH পরবর্তী স্টেশন পাঞ্জিপাড়ায় হিসেবমত ইনফরমেশন দিয়ে দেন যে অবধ আসাম এক্সপ্রেস আপ লাইন দিয়ে বেরিয়ে গেছে নিউ জলপাইগুড়ির দিকে , কিন্তু আদতে ট্রেনটি ডাউন লাইনে ছিল।।
ট্রেন ৩১ নং জাতীয় সড়ক পার করে, তাই রাস্তায় লেভেল ক্রসিং পড়ে, কিন্তু কারেন্ট না থাকা বা বৃষ্টির জন্য তারা ক্রসিংয়ে থাকা কোনো কর্মচারী এটা লক্ষ্য করেনি যে ট্রেন ডাউন লাইনে যাচ্ছে , আপে নয়।
কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এই ট্রেনের ড্রাইভার আর. রায় এটা নোটিস করেনি তিনি বাম নয়, ডানদিকের লাইন ধরে যাচ্ছেন , এবং তার পাশে যতগুলো গ্রিন সিগন্যাল পড়ছে ওগুলো আসলে তার জন্য নয়, উল্টোদিক থেকে আসা দিল্লিগামী ডাউন ব্রহ্মপুত্র মেলের জন্য।
রাত ১২টা ৪০, দিল্লিগামী ব্রহ্মপুত্র মেলের অভিজ্ঞ ড্রাইভার বি.সি. বর্ধন নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ট্রেন ছেড়ে বেরোলেন, বাইরে তখন গাঢ় অন্ধকার, সাথে মুষলধারে বৃষ্টি। । গাইসল স্টেশন পার করতেই উল্টোদিকের ট্রেনের আলো দেখতে পেলেন তিনি, অভ্যাসমতই গ্রিন লাইট বের করে হাতে নেন তিনি, কিন্তু একি, ট্রেনের আলো আরেকটু কাছে আসতেই তিনি বুঝতে পারেন পাশের নয়, তার ট্রাকেই এগিয়ে আসছে ট্রেনটি ,,হর্ন দিতে শুরু করেন জোরে, চেপে ধরেন ইমার্জেন্সি ব্রেক, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে .....
গাইসল পশ্চিমের কেবিনম্যান ওয়াই. মারান্ডি অন্ধকারে কেবিনে বসেছিল। বাইরে ভয়ঙ্কর বৃষ্টি হচ্ছিল। জাস্ট 1 মিনিট হয়েছে ব্রহ্মপুত্র মেল পাস করেছে , ঠিক সেইসময় হটাৎ ভয়ানক বিস্ফোরণের আওয়াজ,
রাত ১টা বেজে ৪৫, ভারতীয় রেল যেটাকে "একসিডেন্ট" না বলে "ডিজাস্টার" বলে, সেটা ঘটে গেল। মুখোমুখি সংঘর্ষ হল 80 কিমি প্রতি ঘন্টার অবধ আসাম এক্সপ্রেস এবং ১০০কিমি প্রতি ঘন্টার ব্রহ্মপুত্র মেলের। আর্মির কোচ আর জেনারেল কামরাগুলো ছিটকে গেল এদিক ওদিক,কতজনের দেহ ছিটকে পড়ল পাশের গ্রামের কারো বাড়ির উঠানে,কারো বাড়ির ছাদে ।
৭টা জেনারেল কোচ ও একটা আর্মি কোচ প্রায় নিশ্চিন্ন হয়ে যায়,সরকারি হিসেবে মৃত্যু ৩০ সাথে ৯০ জন জওয়ান, যারা কার্গিল যুদ্ধ শেষে বাড়ি যাচ্ছিলেন ,আহত ৬০০বেসরকারি হিসেব বলে ১০০০ এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল, । কারণ জেনারেল কোচের যাত্রীদের সঠিক হিসেব থাকে না।
স্টেশন মাস্টার R N singh , এবং কেবিনম্যান মারান্ডি সেই রাতেই পালিয়ে যায় ।
শোনা যায় পরে স্টেশন মাস্টার সুইসাইড করেছিলেন , নোটে লিখেছিলেন উনি সেদিন অবধ আসাম এক্সপ্রেসকে গ্রিন সিগনাল দেবার আগে যদি চেক করে নিতেন,তাহলে হয়তো এত মানুষ প্রাণ হারাতো না।
উল্লেখ্য তৎকালীন রেলমন্ত্রী নীতিশ কুমার ২তারিখ সকালে এসে পৌঁছান ঘটনাস্থলে , কিন্তু ডিজাস্টার manage এর ট্রেন আসে বিকেলে, নীতিশ কুমার ঘটনার ভয়াবহতা দেখে শিউরে উঠেছিলেন বলে শোনা যায়, পরে দিল্লি গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রী অটল বিহারী বাজপেয়ির কাছে নৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগ পত্র জমা দেন।
এটাও শোনা গিয়েছিল উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজে তখন লাশ রাখার জায়গা হচ্ছিল না, অনেক মৃতদেহ বা দেহাংশ কুকুর-শিয়ালেরা টেনে নিয়ে গেছিল।
এই ভয়াবহ ঘটনার ২১ বছর পূর্ণ হলো 🙂
আশা করবো ভবিষ্যতে এরকম আর হবে না😭😭😭😭
#সংগৃহিত

0 Comments